বিধবা - আদিত্য অনীক

বিধবা
আদিত্য অনীক
আমি যখন ছোট্ট তখন বাবার বাড়ি ছিলাম,
ফুলের মত তুলতুলে তাই কুসুম আমার নাম ।
চাঁদের সাথে খেলা করি স্বপ্নে ভাসাই তরী,
আমি ছিলাম কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট সুন্দরী ।
ভাইয়ের আদর মায়ের স্নেহ বাবার জাতিকুল,
এসব মাথায় করে হঠাৎ বিয়ের ফুটলো ফুল ।
বুকে টেনে বললো বাবা দু’চোখ ছলোছলো,
এখন থেকে শ্বশুরবাড়ি তোমার বাড়ি হলো ।
নারী জাতির বাপের বাড়ি চিরকালই পর,
শ্বশুরবাড়ি আসল বাড়ি ওটাই নিজের ঘর ।
শ্বশুরবাড়ি এসে দেখি অন্য রকম খেলা,
কানের কাছে দিন-রজনী বাজে বুবু-জেলা ।
রুদ্ধদ্বারের শ্বশুরবাড়ি ভিতর মহল থাকি ,
ঘোমটা খুলে খিড়কি দিয়ে আসমানে চোখ রাখি।
শ্বশুর বলেন রেগে-মেগে “ আসমানে কী চাও ?
আমার বাড়ি থাকতে হলে মাথায় কাপড় দাও ।”
বিয়ের আগে বাপের বাড়ি ছিল আমার ঠাই,
বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি নিজের বাড়ি নাই ।
শ্বশুর-বাবা মারা গেলেন স্বর্গে দিলেন পাড়ি,
হাত বদলে শ্বশুরালয় হলো স্বামীর বাড়ি ।
স্বামী আমার অধিপতি আমি ক্ষুদ্র প্রজা,
সকল ভালোর কৃতিত্বে তার উড়ে জয়ধ্বজা ।
দুঃখ-ব্যথা-অমঙ্গলে, ভ্রান্তি এবং ভয়ে,
আমার মাথা বলির পাঁঠা সকল বিপর্যয়ে ।
স্বামী ছিল অশ্বত্থ গাছ ডালে ডালে পাখি,
তারই ছায়ার নির্ভরতায় জীবন ধরে রাখি ।
স্বামী মারা যাবার পরে আমার দুটি ছেলে,
দেয়াল তুলে বাড়িটাকে দু’ভাগ করে ফেলে ।
এজমালিতে ছিল শুধু সিঁড়ির চিলেকোঠা ,
আমার থাকার জন্য নাকি দারুণ হবে ওটা ।
সকাল বিকেল ছাদে গেলে সূর্য যাবে দেখা,
অন্ধকারে দেখতে পাবো ছায়াপথের রেখা ।
এ সপ্তাহে বড় ছেলে ও সপ্তাহে ছোটো ,
তুলাদণ্ডে আমার খাবার ভাগ হয়ে যায় দু’টো ।
মা মরেছে বাপ মরেছে আছে মাথার ভাই,
মাঝেমাঝে ভাইয়ের বাড়ি নাইওর করতে যাই ।
কদিন যেতেই ভাইয়ের ঘরে বাড়তি হয়ে পড়ি,
ইচ্ছে করে পুকুর জলে কলসি বেঁধে মরি ।
শ্বশুরবাড়ি স্বামীর বাড়ি ছেলের বাড়ি আছে,
আমি যেন গাই-হনুমান লাফাই গাছে গাছে ।
বড় ছেলের কাস্টমে জব টাকা কাড়ি কাড়ি,
ছোট ছেলে গ্রামীণ ফোনে পদ-পদবী ভারী ।
ডেভেলপার এসে একদিন বাড়ি বুঝে নিলো,
তাদের হাতে বড় ছেলে চাবি তুলে দিলো ।
পুরাণ বাড়ি ভেঙ্গে ফেলে নতুন করে তবে
চোখ ধাঁধানো পঁচিশ তলা উঁচু দালান হবে ।
দু’ছেলে দুই পোশ এলাকায় ভাড়ায় নিলো ফ্লাট,
এক লহমায় চুকিয়ে দিল একান্নতার পাট ।
মাল-সামানা তুলে নিলো ভাড়াটে বাড়িতে,
সমস্যাটা হলো তাদের আমায় তুলে নিতে ।
বড় বউয়ের ভাই-বোনেরা তাদের সাথে থাকে ,
গিঞ্জি বাসায় কেমন করে শাশুড়িকে রাখে ?
ছোট্ট ছেলের বাসা ভর্তি নানান ক্যালাব্যালা,
ছেলেমেয়ের সংখ্যা বেশি জিনিসপত্র ম্যালা ।
ওদের বাসা খুবই ছোট, খুব বেশি নেই ঠাই,
এতকিছু রাখার পর আর মায়ের জায়গা নাই ।
ছেলে দু’টি সুশিক্ষিত আদব-লেহাজ মাপা,
বউয়ের কথার বাইরে তারা কেউ ফেলে না পা ।
মাকে এখন রাখে কোথায় কঠিন ধারাপাতে,
নাদুস-নুদুস ছেলে দু’টোর ঘুম আসে না রাতে ।
অনেক বুদ্ধি খরচ করে খুঁজলো সমাধান,
অবশেষে বৃদ্ধাশ্রমে মিললো আমার স্থান ।
নিরিবিলি খোলামেলা উদার পরিবেশ,
ইবাদত আর বন্দেগীতে থাকবো নাকি বেশ ।
এখন আমি বিধবা মা মানুষ বলে রাড়ি,
মেয়েলোকের কবর ছাড়া হয় না নিজের বাড়ি ।
নিঃসঙ্গ দিন নিঃসঙ্গ রাত যাচ্ছে সময় কেটে,
পোড়া চোখের জলে ভিজি অতীত স্মৃতি ঘেঁটে ।
ঈদের খুশী রোজা খুশী জন্মদিনের সুখে,
ছোট্ট দুটি খোকার জামা ঝাপটে ধরি বুকে ।
গভীর রাতের নামায শেষে বলি মোনাজাতে,
আমার অবোধ ছেলে দু’টো থাকুক দুধে-ভাতে ।

Jhon Mond

Phasellus facilisis convallis metus, ut imperdiet augue auctor nec. Duis at velit id augue lobortis porta. Sed varius, enim accumsan aliquam tincidunt, tortor urna vulputate quam, eget finibus urna est in augue.

Post a Comment