রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই শ্লোগানে ৫২‘র আমতলা গেইট

৫২‘র আমতলা গেইট এখন হকার ভবঘুরের আস্তানা




    ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেলেও ভাষা আন্দোলনের অনেক ঐতিহাসিক স্থানই পায়নি তার সঠিক মর্যাদা। তেমনই একটি স্থান আমতলা গেইট। ৫২’র ভাষা আন্দোলন চলার সময় একুশে ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা, ছাত্র-জনতা এই জায়গাতেই অমান্য করে রাজপথে নেমেছিল। আমতলা গেইটের সামনে চলে ভাষা- সংগ্রামীদের উপর লাঠিচার্জ, গুলি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশপথের পূর্বপাশের গেইটই সেই ঐতিহাসিক আমতলা গেইট।

কালের সাক্ষী হয়ে অরক্ষিত অবস্থায় অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে আমতলা গেইট। বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষই জানে না এই আমতলা গেইটের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের স্থান হিসেবেও পরিচিতি পায়নি গেইটটি। ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬৫ বছর পার হতে চলল, অথচ এখনো এখানে সামান্য একটি নামফলকও স্থাপন করা হয়নি।

ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের দেওয়া একটি টিনের সাইনবোর্ডের মাধ্যমে কোনোরকম চেনা যায় গেইটটি। ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, ভাষা সংগ্রামী প্রয়াত কাজী গোলাম মাহবুব ট্রাস্ট পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আমতলা গেইটটি যেমন রয়েছে স্বীকৃতিহীন অবস্থায় তেমনি স্থানটিও সুরক্ষিত নয়। একসময়ের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল এই স্থানে এখন অসংখ্য ভাসমান দোকান। এখানে ভাজা পোড়া, চা, ফিরনি, ঝালমুড়ি বিক্রেতা হকাররা যেমন আছে তেমনি রয়েছে মশারি, প্লাস্টিক সামগ্রী, কম্বল ও ফলের দোকান। এদের ক্রেতা মূলত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর আত্মীয়-স্বজন। গেইটভবনের ভেতর দু’পাশে দুটি পরিবার বসবাস করতেও দেখা গেল।

সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে গত প্রায় ১৫ দিন প্রশ্ন করেও ঐতিহাসিক এই স্থানটি সংরক্ষণের দায়িত্ব কার সে বিষয়টির কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

ভাষা আন্দোলন চলাকালে আমতলা গেইটটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল, বর্তমানে এটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. খাজা আব্দুল গফুর পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এরকম তিনটি গেইট আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমতলা গেইটটি চলাচলের কাজে ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না বলে এটি বাহির থেকে তালা মেরে রাখা হয়েছে। এছাড়া তিনটি গেইটই রঙ ও প্লাস্টার করাসহ অন্যান্য সংস্কারের কাজ করা হয়। কিন্তু এখানে নামফলক দেওয়া বা ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করা তো মেডিকেল কলেজের পক্ষে সম্ভব নয়। এটা তো অন্য কোনো অধিদপ্তর থেকেও করা হয় নাই।

আমতলা গেইটের সামনে হকারদের অবৈধ দখল সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা তো সিটি করপোরেশনে আওতাভুক্ত। আমরা মাঝে মাঝে উচ্ছেদ করি তবে সবসময় এটা ধরে রাখা যায় না। সবসময় হকারমুক্ত রাখা তো সিটি করপোরেশন ও পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব।

আমতলা গেইটভবনের ভেতর লোকজন বসবাস করার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে পাকিস্তান আমল থেকেই লোক বসবাস করছে। এখানে থাকে ইমারজেন্সি বিভাগের কর্মকর্তারা। তিনটা গেইটেই থাকার ব্যবস্থা, লোকজন থাকলে বরং এটা ভালো থাকবে, না হয় নষ্ট হয়ে যাবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে আমতলা গেইটকে ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে না জানার পর এই প্রতিবেদক যান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। সেখানে মেয়র সাঈদ খোকনকে আমতলা গেইট সম্পর্কে বলা হলে তিনি বলেন, আমরা অনেকবার হকার সরিয়েছি, সকালে সরালেই বিকালে বসে যায়। হকারমুক্ত রাখা যে কি কঠিন কাজ তাতো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন। এরপরও এ বিষয়ে আমরা বেশ কঠোর অবস্থানে আছি, পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশনের সব এলাকা হকারদের অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে।

আমতলা গেইটের তাৎপর্য তুলে ধরে এখানে অন্তত নামফলক তৈরি করা ও সংরক্ষণ করার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘এটা তো মেডিকেল কলেজের স্থাপনা। এর বাইরের অংশটা আমার দায়িত্বে।’

মেডিকেল বলছে এটা তাদের কাজ না, সিটি করপোরেশন বলছে এটা তাদেরও কাজ না প্রশ্ন তুললে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘কি লিখতে হবে আপনি ড্রাফুট করে লিখে আনুন, আমি কাজটা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্মৃতিস্থান আমতলা গেইট সংরক্ষণ ও নামফলকের বিষয়ে সাংস্কৃতিক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এটা ঢাকা মেডিকেল কলেজেরই দায়িত্ব ছিল। একটা ঐতিহাসিক স্থান তাদের অধীনে আছে এটা তো তারা গর্বের সাথেই করতে পারত। যাহোক প্রসঙ্গটা যেহেতু উঠলো, আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। কেউ যদি না করে তাহলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে একটা স্থাপনা নির্মাণের ব্যবস্থা আমরা করব। তবে দেখাশুনার দায়িত্ব ডিএমসিকেই নিতে হবে। আমরা তো প্রতিদিন গিয়ে ওটা দেখে রাখতে পারব না।

১৯৫২ সালে বর্তমান আমতলা গেইট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের একাংশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ছিল। কলাভবনের সামনে একটি বড় আমগাছ ছিল। সেই আমতলাতেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন সভা, সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। পরে কলাভবন বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হলে এখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ চালু করা হয়। আমগাছটি একসময় মারা গেলে এর একটি খণ্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু সংগ্রহশালায় কাচের তৈরি বাক্সে সংরক্ষণ করা হয়।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাংশে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা হয়। সভায় সাধারণ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়ে পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে আমতলা গেইট দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ করে, ছাত্রীরাও এ আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্রছাত্রীরা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া শুরু করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসররত মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জববার, আবুল বরকত নিহত হন।

Blogkori

Phasellus facilisis convallis metus, ut imperdiet augue auctor nec. Duis at velit id augue lobortis porta. Sed varius, enim accumsan aliquam tincidunt, tortor urna vulputate quam, eget finibus urna est in augue.

Post a Comment