সংক্ষিপ্ত সূত্রাবলি- বাংলা উচ্চারণের (১-২৮) । blogkori

বাংলা উচ্চারণের সংক্ষিপ্ত সূত্রাবলি



বাংলা্ উচ্চারণের বিশেষ কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। রেডিও-টিভিতে প্রচারিত খবর, আবৃত্তি বা শিল্পীর কণ্ঠে গান শুনতে গিয়ে আমরা বিষয়টি টের পাই। তারা আর দশজন থেকে ভিন্নভাবে উচ্চারণ করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ থেকে কিসে তাদের উচ্চারণে ভিন্নতা এনে দেয়, বিষয়টি আমাদের অজানা। 'বাংলা উচ্চারণের সংক্ষিপ্ত সূত্রাবলি' আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে আপনিও শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলা শিখে নিতে পারেন। 

পর্ব - (১)

বাংলা ভাষার প্রথম স্বরধ্বনি অ-এর উচ্চারণ নিয়েই আমাদের উচ্চারণ-বিধির সূত্রপাত। কারণ শব্দের আদি, মধ্য এবং অন্তে ব্যবহৃত ‘অ’ কখনো অবিকৃতভাবে আবার কখনো ও-কারের মতো উচ্চারিত হয়ে থাকে। ‘অ’ যেসব শব্দে আদিতে অবিকৃত বা নিজস্ব উচ্চারণে বিশিষ্ট, তার মধ্যে রয়েছে—তল, ঢল, জল, ফল, বলা, চলা, সহজ, সরল, গরল, তরল, মরদ, পরশ, সরস ইত্যাদি।

‘অ’-এর বিকৃত বা ও-কারের মতো উচ্চারণ—অতি (ওতি), বউ (বোউ), ভালো (ভালো), মতন (মতোন) প্রভৃতি। এখানে অ-এর ‘ও’ উচ্চারণ অবশ্য অনেকটা হ্রস্ব, সহজ কথায় বলা যায় অ-এর উচ্চারণ কিছুটা ও-ঘেঁষা হয়। এটা সর্বত্র হয় না, হয় বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ ধ্বনির প্রভাবে। অতএব অ-এর ও-কারে রূপান্তরিত হওয়ার কিছু নিয়ম উল্লেখ করা যেতে পারে :

শব্দের আদিতে যদি অ-কার (সেটা আদি ব্যঞ্জনে যুক্তও হতে পারে) থাকে এবং তার পরের অক্ষরে ই (হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘ) কিংবা ই-কারান্ত, উ-কারান্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকলেও অ-কারের উচ্চারণ ও-কারের মতো হয়ে যায়। যেমন—অসি (ওসি), গতি (গোতি), মতি (মোতি), পতি (পোতি), যতি (জোতি), সতী (শোতি), ভগ্নি (ভোগনি), লগ্নি (লোগনি), মধু (মোধু), বসু (বোসু), কদু (কোদু), যদু (জোদু), অঙ্গুলি (ওঙ্গুলি), বধূ (বোধু), সমূহ (শোমুহ) ইত্যাদি।

পর্ব - (২)

-এর পর -ফলাযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকলে -এর উচ্চারণ সাধারণত -এর মতো হয় যথাঅদ্য (ওদ্দো), গদ্য (গোদদো), পদ্য (পোদদো), সত্য (শোততো), অত্যন্ত (ওততন্তো), অধ্যাপক (ওদধাপক), সহ্য (শোজঝো) ইত্যাদি

পর্ব - (৩)

জ্ঞ (+) কিংবা ক্ষ (+) থাকলেও আগের -কার -কারের মতো উচ্চারিত হয় যেমন যজ্ঞ (জোগগোঁ, লক্ষ্য (লোকখো), রক্ষ (রোকখো), দক্ষ (দোকখো), অক্ষর (ওকখোর), পক্ষ (পোকখো) ইত্যাদি 

কিন্তু এসব নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনাঅর্থে শব্দের আদিতেকিংবাঅনথাকলে অথবা সহিত অর্থে , সম, সন সংযুক্ত থাকলে সে ক্ষেত্রে -এর অবিকৃত থাকবে (পরে , , , যা- থাকুক না কেন) যেমন-অস্থির, অধীর, অসুখ, অনুপস্থিত, অনুচিত, অতুল, অমূল্য (ওমুললো হতে পারে), অবিনাশ, অশুভ, অকূল, অদূর, অনূঢ়া, অনতিবিলম্বে, অবিচার, অতিষ্ঠ, অনুদার, সম্পূর্ণ, সম্প্রতি, সবিনয়, সবিশেষ, সমূল, সঠিক, সস্ত্রীক, অব্যয়, অখ্যাতি, অজ্ঞ, অক্ষম, অক্ষর, সক্ষম ইত্যাদি


পর্ব - (৪)

-ফলাযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের আগের হয়-যথা বক্তৃতা (বোক্তৃতা), মসৃণ (মোসৃণ) ইত্যাদি এখানেও অন, (না অর্থে) কিংবা সহিত অর্থে, সম্পূর্ণ অর্থে সম ইত্যাদি সংযুক্ত হলেও উচ্চারণ বিকৃত হবে না, অমৃত (ওমৃত হবে না), অনৃত কিংবা সমৃদ্ধ ইত্যাদি

পর্ব - (৫)

-ফলা আদ্য ব্যঞ্জনের সঙ্গেযুক্ত থাকলে (রবীন্দ্রনাথের কথায় লিপ্ত থাকলে) তা হয়ে যায়-শ্রবণ (স্রোবোন), প্রভাত (প্রোভাত), প্রকাশ (প্রোকাশ), প্রণাম (প্রোনাম), গ্রহণ (গ্রোহোন), ভ্রমণ (ভ্রোমোন), ভ্রম (ভ্রোমো), ভ্রমর (ভ্রোমোর), গ্রহ (গ্রোহো), ব্রজ (ব্রোজো) ইত্যাদি
আলোচ্য পাঁচটি সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে-, , , -কার, -ফলা, জ্ঞ, যুক্তবর্ণ এবং ক্ষ থাকলে আদ্য -এর উচ্চারণ সাধারণত -কার হয়ে থাকে


পর্ব - (৬)

এবার মধ্য -এর উচ্চারণ সম্পর্কে লক্ষ্য করা যাক। মধ্য -এর পর যদি , , , -কার, এবং -ফলাযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ বা ক্ষ থাকে, তাহলে তার আগে মধ্য -এর উচ্চারণ হবে -কারের মতো-প্রণতি (প্রোনোতি), বিরতি (বিরোতি), অগণিত (অগোনিত), সমভূমি (সমোভুমি), আলস্য (আলোশশো), সহস্র (সহোস্রো), যবক্ষার (যবোকখার) ইত্যাদি


পর্ব - (৭)

মধ্য -এর আগে যদি , , , এবং -কার থাকে, তবে সাধারণত মধ্যউচ্চারণে -কার হয়-মতন (মতোন), যতন (জতোন), রতন (রতোন), শতক (শতোক), জলদ (জলোদ), বলদ (বলোদ), গলদ (গলোদ), শরৎ (শরোত), ভরত (ভরোত), কলস (কলোশ), সরস (শরোশ), কাজল (কাজোল), কাগজ (কাগোজ), হাজত (হাজোত), মানত (মানোত), কানন (কানোন), প্রাথমিক (প্রাথোমিক), আতর (আতোর), আগর (আগোর), ডাগর (ডাগোর), সাগর (শাগোর), নাগর (নাগোর), ওজন (ওজোন), রোচন (রোচোন), লোচন (লোচোন), শোধন (শোধোন), বোধন (বোধোন), শোষণ (শোশোন), লোশন (লোশোন), পোষণ (পোশোন), তোষণ (তোশোন), ওতপ্রোত (ওতোপপ্রোতো), বেতন (বেতোন), চেতন (চেতোন), বেদম (বেদোম), লেহন (লেহোন), শেখর (শেখোর), কেশর (কেশোর) ইত্যাদি


পর্ব - (৮)

খাঁটি বাংলা শব্দ কিংবা পদে ক্ষেত্রবিশেষে অনু -এর উচ্চারণ -কারের মতো হয়ে থাকে। বাংলায় অনু -কার আগের ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে মিশে থাকে বলে প্রায়ই উচ্চারিত হয় না। ফলে সংস্কৃতিতে উচ্চারিত এই -ধ্বনিটি বাংলা উচ্চারণে লুপ্ত হয়ে হসন্তরূপে উচ্চারিত হয়ে থাকে্-নাক, কান, হাত, জাত, মান, খান, শান, জান, বান, গান, মলিন, পুলিন, কুলিন, তুহিন, সরল, গরল, তরল ইত্যাদি। কিন্তু -কার বা -কারের পর (ইয়) থাকলে সেই - অন্তর্গত -এর উচ্চারণ লোপ পায় না-প্রিয়, পেয়, দেয়, বিধেয়, শ্রেয় ইত্যাদি। কতগুলো বিশেষণে কিংবা বিশেষণরূপে ব্যবহৃত পদে অন্তিম -কার লুপ্ত হয় না-কাল (কালো রং বা বর্ণ অর্থে) ছোট (ছোটো), খাট (খাটো), শ্বেত (শেতো), ভাল (ভালো শুভ অর্থে), হীন (হিনো), এত (অ্যাতো), যত (যতো), হেন (হ্যানো), যেন (জ্যানো), কেন (ক্যানো), এগার (অ্যাগারো), বার (বারো সংখ্যা অর্থে), সতের (শতেরো), পনের (পনেরো) ইত্যাদি

পর্ব - (৯)

আন-প্রত্যয়ান্ত শব্দের অন্তিম -কার সাধারণত উচ্চারণে -কার হয়ে যায়-করান (করানো), ধরান (ধরানো), তাড়ান (তাড়ানো), গড়ান (গড়ানো), সরান (শরানো) ইত্যাদি।
দ্বিরুক্তি বিশেষণে এবং অনুকার শব্দের অন্তিম হয়-পড়-পড় (পড়ো-পড়ো), কাঁদ-কাঁদ (কাঁদো-কাঁদো), কল-কল (কলো-কলো)


পর্ব - (১০)

ক্রিয়াপদের অন্তিম -এর উচ্চারণ প্রায়ই -এর মতো হয়-করল (কোরলো), বসব (বোসবো), করত (কোরতো), জমল (জোমলো), দেখত (দেখতো), লিখত (লিখতো) ইত্যাদি।
অন্ত -এর আগে যদি সংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকে, তাহলে সেই লুপ্ত হয় না এবং উচ্চারণে -কার হয়ে যায়-শক্ত (শকতো, চিহ্ন (চিন্নোহ), ধর্ম (ধরমো, যত্ন (জতনো, রত্ন (রতনো), দৃশ্য (দৃশশো), বিজ্ঞ (বিগগোঁ), পদ্ম (পদদোঁ, গ্রীষ্ম (গ্রিশশোঁ) ইত্যাদি

পর্ব - (১১)

বিশেষ্য শব্দের শেষে এবং বিশেষণ শব্দের শেষে (+) থাকলে অন্ত -এর বিলুপ্তি ঘটে না-গূঢ়, গাঢ়, দেহ, স্নেহ, কলহ, বিবাহ, সিংহ ইত্যাদি। এখানে উচ্চারণে হয়ে যায়-গুড়হো, দেহো, স্নেহো, কলোহো, বিবাহো, শিংহো ইত্যাদি।

এবং ইত প্রত্যয়যোগে গঠিত বিশেষণ শব্দের অন্তিম -এর বিলুপ্তি হয় না-গীত, নত, রত, পুলকিত, রক্ষিত ইত্যাদি। কিন্তু ধরনের শব্দই যখন বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হয়, তখন -কারের বিলুপ্তি ঘটে। গীত (গীৎ), রক্ষিত (রোকখিত্ পদবি অর্থে)


পর্ব - (১২)

অন্তিম -এর আগে যদি জ্ঞ, এবং বা ক্ষ-ফলা থাকে, তবে হসন্ত হয় না এবং উচ্চারণে -কার আসে। যেমন-দুঃখ (দুকখো), বঙ্গ (বঙগো), রঙ্গ (রঙগো), সঙ্গ (শঙগো), বংশ (বঙশো, বিংশ (বিঙশো, হংস (হঙশো), শ্রম (শ্রোমো), ব্রত (ব্রোতো), বৃষ (বৃশো), কৃশ (কৃশো), তৃণ (তৃনো) ইত্যাদি

পর্ব - (১৩)

বাংলা উচ্চারণে -এর মতো স্বরধ্বনির উচ্চারণে তেমন কোনো বিভ্রান্তি নেই। প্রায় সর্বত্রই -কারের উচ্চারণ অবিকৃত থাকে, তবে সামান্য দু-এক জায়গায় ব্যতিক্রম ঘটে। যেমন একাক্ষর দীর্ঘ উচ্চারিত্-রাগ (রা-গ্), ভাগ (ভা-গ্), থাক (থা-ক্) এখানে -কারের উচ্চারণ যেমন দীর্ঘ, ভাগা, রাগা, থাকা-তে কিন্তু -কার তেমনি দীর্ঘরূপে উচ্চারিত নয়।

শব্দের আদিতে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহৃত কিংবা আদি ব্যঞ্জনে যুক্ত ভিন্ন, সর্বত্র - উচ্চারণ অবিকৃত থাকে। আদিতে ব্যবহৃত স্বতন্ত্র বা ব্যঞ্জনে যুক্ত - উচ্চারণ মাঝেমধ্যে অ্যা-এর মতো হয় (ইংরেজি অ্যাট, ক্যাট- ব্যবহৃত - মতো) উচ্চারণকে অনেকেবাঁকা বলে থাকে। সংস্কৃতে কিংবা প্রাকৃতে -কারের ধরনের উচ্চারণের সন্ধান মেলে না। সে যা- হোক, আদ্য -কারের উচ্চারণ কোথায় বিকৃত বা বাঁকা হবে কিংবা হবে না তা দেখা যাক। শব্দের প্রথমে যদি -কার (ব্যঞ্জনে যুক্তও হতে পারে) এবং তার পরে , , , , , , , , এবং থাকে, তবে সাধারণত -এর উচ্চারণ বিকৃত বা বাঁকা হয় না।
. কিংবা থাকলে-একি, দেখি, মেকি, ঢেঁকি, দেশি, পেশি, বেশি ইত্যাদি।
. -একুনে, সেগুনে, বেগুন, রেঙ্গুন, বেদুইন, কেয়ুর ইত্যাদি।
. -মেয়ে, এনে, চেয়ে, এযে, সেজে, দেখেছি, রেগে, বেগে, যেতে ইত্যাদি। 


অবশ্য নিয়মের কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায়। যেমন-একের (অ্যাকের), একে-একে (অ্যাকে-অ্যাকে) ইত্যাদি।
. -শ্রেয়, প্রেয়, চেয়ার, দেয়াল, মেয়াদ, পেয়াদা, পেঁয়াজ, খেয়া, নেয়া, কেয়া, মেয়র ইত্যাদি। ব্যতিক্রম-দেয় (দ্যায়), নেয় (ন্যায়) ইত্যাদি। 


. -এর, সের, টের, ঢের, ঘের, জের, বের ইত্যাদি।
. উষ্মবর্ণ (, , , )-বেশ, লেশ, দেশ, পেশ, শেষ, এস (এসো), কেহ, দেহ, স্নেহ, মেহ, বেহারা, বেহালা, লেহন ইত্যাদি।
. -তেল, বেল, মেল, শেল, জেল, এল, ভেল, ফেল, রেল ইত্যাদি


পর্ব - (১৪)

আদ্য - পর যদি , কিংবা জ্ঞ থাকে এবং তার পরে , , , কিংবা অনুপস্থিত থাকে, সে ক্ষেত্রে -কারের উচ্চারণ সাধারণত বিকৃত হয়-খেংরা (খ্যাংরা), ভেংচানো (ভ্যাংচানো), নেংটা (ন্যাংটা। কিন্তু এখানে টার পরিবর্তে টি দিলে উচ্চারণ হবে নেংটি, টেংরা (ট্যাংরা কিন্তু দিলে টেংরি) ইত্যাদি।


পর্ব - (১৫)

পরে লা থাকলে সাধারণত আদ্য -কারের বিকৃত উচ্চারণ হয়ে থাকে-খেলা (খ্যালা), চেলা (চ্যালা), ঠেলা (ঠ্যালা), মেলা (ম্যালা), কেলা (ক্যালা), গেলা (গ্যালা গমন অর্থে ইত্যাদি। কিন্তু জিলা থেকে জেলা হবে, মিল থেকে মেলা এবং গিল ধাতু (গলাধঃকরণ) থেকে গেলা। 


বাংলা্ উচ্চারণের বিশেষ কিছু নিয়ম রয়েছে। রেডিও-টিভিতে প্রচারিত খবর, আবৃত্তি বা শিল্পীর কণ্ঠে গান শুনতে গিয়ে আমরা বিষয়টি টের পাই। বুঝতে পারি, আর দশজন থেকে তাদের উচ্চারণে ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু কিসে তাদের উচ্চারণে ভিন্নতা এনে দেয়, তা বুঝতে পারি না। 'বাংলা উচ্চারণের সংক্ষিপ্ত সূত্রাবলি' আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে আপনিও শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলা শিখে নিতে পারেন


পর্ব - (১৬)

পরে এবং স্বরধ্বনি থাকলে কিংবা কোনো স্বরধ্বনি না থাকলে আদ্য -কারের বিকৃত উচ্চারণের প্রবণতা থাকে সমধিক-এখন (অ্যাখোন), এক (অ্যাক), ফেন (ফ্যান ভাতের মাড়), একা (অ্যাকা), দেখা (দ্যাখা), কেন (ক্যানো), খেলা (খ্যালো), জেঠা (জ্যাঠা), বেটা (ব্যাটা), পেঁচা (প্যাঁচা) ইত্যাদি। ক্ষেত্রবিশেষে -কার থাকলেও আদ্য -কারের উচ্চারণ বিকৃত হতে দেখা যায়-মেও (ম্যাও), দেওর (দ্যাওর) ইত্যাদি। কিন্তু -কারের পরে , , , থাকলে সাধারণত -কার অবিকৃত থাকে-খেলি, জেঠি, একুশ, এখনই


পর্ব - (১৭)

যেসব ক্রিয়ামূল (ধাতু) বা শব্দমূলের আদিতে ছিল পরে -কারে পরিবর্তিত তারপর , লা প্রভৃতি থাকলেও উচ্চারণ বিকৃত হবে না-পেটা (পিট্ থেকে), লেখা (লিখ থেকে), শেখা (শিখ থেকে) জেলা (জিলা থেকে) ইত্যাদি

পর্ব - (১৮)

বাংলা লিখিত ভাষায় যেসব ব্যঞ্জনবর্ণ আছে, তার মধ্যে , , , , , , এসব একক বর্ণের এবং জ্ঞ, ক্ষ প্রভৃতি যৌগিক ব্যঞ্জনের স্বতন্ত্র উচ্চারণ শোনা যায় না। এর মধ্যে -এর উচ্চারণ অনুনাসিক হয় অর্থাৎ ইয়ঁ-এর মতো, আবার শব্দের মধ্যে বর্গের চারটি বর্ণের সঙ্গে সংযুক্ত হলে -এর উচ্চারণ দন্ত্য -এর মতো হয়ে যায়-কঞ্চি (কোনচি), পঞ্চ (পনচো), অঞ্জলি (অনজোলি), ব্যঞ্জন (ব্যানজোন), বাঞ্ছা (বানছা), অন্যত্র মিঞা (মিয়াঁ) ইত্যাদি

পর্ব - (১৯)

-এর উচ্চারণ বাংলায় -এর অনুরূপ, -এর উচ্চারণ -এর মতো, এবং -এর উচ্চারণ -এর মতো। বাংলায় হসন্তকে সংক্ষেপে (খণ্ড-) লেখা হয়-উচ্চারণের বেলায় -এর হসন্ত উচ্চারণ বিধেয়। -এর উচ্চারণ (অঙ্) এর মতো হয়ে থাকে। যৌগিকবর্ণ জ্ঞ-এর উচ্চারণ গ্যঁ বা গ্গঁ-এর মতো, ক্ষ-এর খ্য বা ক্খ-এর অনুরূপ। আর -এর উচ্চারণ রি- মতো হয়ে থাকে


পর্ব - (২০)

, এবং -এর উচ্চারণ বাংলায় হলেও যখন দন্তমূলীয় ধ্বনির সঙ্গে , এবং সংযুক্ত হয়, তখন সহধ্বনি হিসেবে দন্ত -এর উচ্চারণ হয়ে থাকে-বিশ্রাম (বিস্স্রাম), মিশ্র (মিস্রো), শ্রী (স্রী), শ্রোতা (স্রোতা), শৃগাল (সৃগাল), হস্ত, মস্তক, প্রশ্ন (প্রোস্নো), স্নিগ্ধ (স্নিগ্ধো), স্নেহ, সৃষ্টি, সজন, বিস্মিত ইত্যাদি



পর্ব - (২১)

-ফলা যে ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়, বাংলা উচ্চারণে সে ব্যঞ্জনধ্বনির দ্বিত্ব হয়-পদ্ম (পদ্দোঁ), আত্মা (আত্তাঁ, গ্রীষ্ম (গ্রিশ্শোঁ), ভস্ম (ভশ্শোঁ), অকস্মাৎ (অকোশশাঁৎ) ইত্যাদি। , , , এবং -এর সঙ্গে -ফলা সংযুক্ত হলে উচ্চারণ অবিকৃত থাকে। যেমন-উন্মাদ (উন্মাদ), চিন্ময় (চিন্ময়), হিরণ্ময় (হিরন্ময়) ইত্যাদি।
-গুল্ম (গুল্মো), শাল্মলী (শালমোলি), বাল্মীকি (বালমিকি) প্রভৃতি। -বাগ্মী (বাগ্মি), যুগ্ম (জুগ্মো) ইত্যাদি


পর্ব - (২২)

-ফলাযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণ সাধারণত দ্বিত্ব হয়-বিদ্যা (বিদ্দা), পূণ্য (পুন্নো), ধন্য (ধোন্নো), অন্য (ওন্নো), পদ্য (পোদ্দো), অদ্য (ওদ্দো), সদ্য (শোদ্দো) ইত্যাদি। তবে -ফলা যদি আদি ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তার দ্বিত্ব না হয়ে উচ্চারণ অনেকটাঅ্যা মতো হয়-ব্যয় (ব্যায়), ন্যস্ত (ন্যাসতো), ব্যস্ত (ব্যাস্তো), ত্যক্ত (ত্যাক্তো) ইত্যাদি

পর্ব - (২৩)

-এর সঙ্গে -ফলা যুক্ত হলে সংযুক্ত বর্ণের উচ্চারণ জঝ্-এর মতো শোনায়-বাহ্য (বাজ্ঝো), গ্রাহ্য (গ্রাজ্ঝো), উহ্য (উজ্ঝো), সহ্য (শোজ্ঝো) ইত্যাদি।
সাধারণত -ফলাযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়ে থাকে-বিশ্বাস (বিশ্শাশ), বিদ্বান (বিদ্দান), নিশ্বাস (নিশ্শাশ) প্রভৃতি



পর্ব - (২৪)

আদ্য ব্যঞ্জনধ্বনিতে -ফলা সংযুক্ত হলে প্রায়ই তার কোনো উচ্চারণ হয় না-ত্বক (তক), দ্বারা (দারা), স্বকীয় (শকিও), স্বামী (শামি কিন্তু যখন ভূস্বামী হয় তখন উচ্চারণ ভূশ্শামী অর্থাৎ -ফলার আগে ভূ আসায় স্বামীর -এর দ্বিত্ব ঘটেছে) ইত্যাদি। সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত -ফলারও উচ্চারণ হয় না-সান্ত্বনা (শান্তোনা), উজ্জ্বল (উজ্জল) প্রভৃতি

পর্ব - (২৫)

উৎ (উদ্) উপসর্গযোগে গঠিত শব্দের’ ()-এর সঙ্গে সংযুক্ত -ফলার উচ্চারণ অবিকৃত থাকে-উদ্বেল (উদ্বেল), উদ্বাহু (উদ্বাহু), উদ্বোধন (উদ্বোধোন), উদ্বেগ (উদ্বেগ) প্রভৃতি। এবং -এর সঙ্গে সংযুক্ত -এর উচ্চারণও ঠিক থাকে-লম্বা (লম্বা), কম্বু (কোম্বু), দুম্বা (দুম্বা), বুম্বা (বুম্বা), লম্ব (লম্বো) ইত্যাদি

পর্ব - (২৬)

স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহৃত হলে উচ্চারণে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয় না। কিন্তু -এর সঙ্গে , , , , ইত্যাদি বর্ণ যুক্ত হলে সম্মিলিত ধ্বনির উচ্চারণে মনে হয় -এর স্থানচ্যুতি ঘটেছে। আসলে এসব ক্ষেত্রে -সংযুক্ত বর্ণ মহাপ্রাণ হয়ে থাকে। যথা-আহ্বান (আওভান), বিহ্বল (বিওভল), জিহ্বা (জিওভা), অপরাহ্ন (অপোরান্নোহ), চিহ্ন (চিন্নোহ), আহ্লাদ (আল্লাদ), আহৃত (আরিহ্তো)

বিসর্গ () : পদমধ্যে ব্যবহৃত বিসর্গ পরবর্তী ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণ দ্বিত্ব করে দেয়। যথা-দুঃখ (দুক্খো), নিঃসঙ্গ (নিশ্শঙ্গো), নিঃশেষ (নিশ্শেশ), অতঃপর (অতোপ্পর)


পর্ব - (২৭)

: দুটি ধ্বনি উচ্চারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় গোলমালের সৃষ্টি হয়। সংস্কৃতে বাংলা শব্দের মধ্যে শেষে ব্যবহৃত হলে উচ্চারণ হয় ড়ঢ় (সংস্কৃতের পীডা, বাংলা ভাষায় পীড়া, তামিল নাডু তামিল-নাডু, মুঢ মুঢ় এবং গাঢ গাঢ়তে রূপান্তরিত) বাংলায় হচ্ছে তাড়নাজাত অল্পপ্রাণ ধ্বনি, আর হচ্ছে -এর মহাপ্রাণ রূপ। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চারণে মহাপ্রাণ ধ্বনির প্রকাশ সচ্ছন্দ নয় বলে গাঢ় (গাড়হ) হয়ে যায়। গাড় এবংপ্রগাঢ় পিতামহীহয় প্রগাড় পিতামহী। কারণে শিক্ষার্থীদের , এবং ধ্বনির উচ্চারণ পার্থক্য সম্পর্কে বিশেষভাবে সচেতন হওয়া দরকার। কম্পনজাত দন্তমূলীয় ধ্বনি এবং হচ্ছে তাড়নাজাত অল্পপ্রাণ ধ্বনি। দুই ধ্বনির স্বতন্ত্র উচ্চারণ সঠিক না হলে কেবল শ্রুতিগত দিক থেকে নয়, অর্থগত দিক থেকেও নানা বিপর্যয় ঘটে। যেমন-আমড়া-আমরা, নাড়ী-নারী, বাড়ি-বারি, শাড়ি-ষারি, মাড়ি-মারি, চুড়ি-চুরি, ছুড়ি-ছুরি, ধড়-ধর, বড়-বর, খোড়া-খোরা এবংতারি লাগি কাঁদি নিশিদিন’-এর পরিবর্তে যদি বলা হয়তাড়ি লাগি কাঁদি নিশিদিনতাহলে কী অবস্থা দাঁড়ায়!

পর্ব - (২৮)

চন্দ্রবিন্দু ( ) অনুনাসিক স্বর বোঝাতে বাংলা লেখায় স্বরধ্বনির উপরে দেওয়া হয়ে থাকে। চন্দ্রবিন্দুকে অনুনাসিক উচ্চারণের প্রতীক বলা যায় (উচ্চারণের সময় নাক দিয়ে বাতাস বের করলেই অনুনাসিক ধ্বনির সৃষ্টি হয়। একেনাকী সুরউচ্চারণও বলা যায়) তবে কথা মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলায় স্বরধ্বনি অনুনাসিক হলে অর্থের পরিবর্তন ঘটে। সুতরাং শিক্ষক, অভিনেতা, পাঠক, ঘোষক, আবৃত্তিকারদের যেমন বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার, তেমনি শব্দের অর্থগত দিকের জন্য শিক্ষার্থীদেরও সম্পর্কে উদাসীন থাকা অনুচিত। কতিপয় উদাহরণের সাহায্যে চন্দ্রবিন্দুর গুরুত্ব উপলব্ধি করা যেতে পারে। কাদা (কর্দম) কাঁদা (রোদন করা), শাখা (ডাল), শাঁখা (শঙ্খের চুড়ি), রাধা (কৃষ্ণের প্রিয়া), রাঁধা (রন্ধন করা), পাক (পবিত্র), পাঁক (পাঁক কাদা), বেটে (পাটের দড়ি), বেঁটে (খর্ব), চাই (আকাঙ্ক্ষা করি), চাঁই (প্রধান সর্দার), ছাদ (ঘরের আচ্ছাদনী), ছাঁদ (গঠন আকৃতি), বাধা (প্রতিবন্ধক), বাঁধা (বন্ধন), কুড়া (বিঘা), কুঁড়া (তুষের কণা), কুড়ি (বিশ), কুঁড়ি (মুকুল), চাচা (কাকা, খুড়া), চাঁচা (ছোলা, মার্জিত), তাত (আঁচ, উষ্ণতা), তাঁত (কাপড় বোনার যন্ত্র), দাড়ি (শ্মশ্রু), দাঁড়ি (তুলাদণ্ড), ফোড়া (স্ফোটক, ব্রন), ফোঁড়া (ছিদ্র করা) ইত্যাদি



বাংলা প্রমিত উচ্চারণ-গোলাম সারোয়ার ভিডিও

বাংলা উচ্চারণ | blogkori.tk, বাংলা্ উচ্চারণ শিক্ষা (www.blogkori.tk), উচ্চারণ শিখার সূত্র (www.blogkori.tk), বাংলা উচ্চারণের সংক্ষিপ্ত সূত্রাবলী (www.blogkori.tk)বাংলা্ উচ্চারণের বিশেষ কিছু নিয়মকানুন (www.blogkori.tk),

Blogkori

Phasellus facilisis convallis metus, ut imperdiet augue auctor nec. Duis at velit id augue lobortis porta. Sed varius, enim accumsan aliquam tincidunt, tortor urna vulputate quam, eget finibus urna est in augue.

Post a Comment