বায়ান্নর স্মৃতি- কামাল লোহানী

‘আমি তখন পাবনা জেলা স্কুলের পরীক্ষার্থী’


রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। কিন্তু এরপর কিছুটা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত যখন ছাত্ররা সংঘবদ্ধভাবে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠানের সময় অ্যাসেমব্লির সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেটা ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির আগের দিন, অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশের এলাকায়। তখন প্রশ্ন ওঠে, এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ব্যবস্থাপক পরিষদের দিকে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না? ছাত্ররা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলসহ সকলকে নিয়ে গঠিত যে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ছিল, তারা সিদ্ধান্ত নেয়, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ঠিক হবে না। আমাদের সেই সামর্থ্য নেই। অতএব, এটা করা যাবে না। ছাত্ররা সেখানে অনড় থাকে তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তে এবং তারা সভা থেকে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা, এখন যেখানে মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি গেট, সেখানে একটি বিখ্যাত আমগাছ ছিল; বলা হতো ঐতিহাসিক আমতলা। সেখানে গাজীউল হকের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির যে আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মতিন, তিনি পূর্বাপর বিশ্লেষণ করে ছাত্রদের সামনে পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এবং তাতে করে উপস্থিত আট থেকে দশ হাজার ছাত্রছাত্রী তারা সমস্বরে একবাক্যে সিদ্ধান্ত নেয়, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে হবে। এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মিছিল বের হয়।

এই মিছিলকে ট্রাকে করে তুলে নিয়ে গিয়ে টঙ্গী পার করে ছেড়ে দিয়ে আসে। কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, কোথাও লাঠিচার্জ করা হচ্ছে, এ রকম চলতে থাকে। কিন্তু দুপুরের দিকে যখন মিছিল মেডিকেল কলেজের দিকে যেতে আরম্ভ করে, তখন পুলিশ গুলি চালায়। সেই গুলি চালানোর পরে ওখানে ছাত্র হত্যা হয়েছে—এই খবর সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার এঁরা গুলিবিদ্ধ হন। এবং পরবর্তীকালে তাঁরা মারা যান। মানে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার মারা যান। ব্যবস্থাপক পরিষদ সেদিন ঘেরাও করা সম্ভব না হলেও সেদিন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন ও আনোয়ারা খাতুন প্রমুখ যাঁরা অ্যাসেমব্লিতে গিয়েছিলেন, তাঁরা মুসলিম লীগেরই তখন সদস্য ছিলেন। তখন তাঁরা অ্যাসেমব্লি থেকে বেরিয়ে এলেন এবং প্রতিবাদ জানালেন।

তাঁরা নুরুল আমিনের কাছে গিয়ে বললেন, পরিস্থিতি কী হয়েছে, বাইরে সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে একটা বিবৃতি পরিষদে দেওয়া হোক। কিন্তু নুরুল আমিন সেটা গ্রাহ্য করলেন না। একুশে ফেব্রুয়ারিতে গুলি চালানোর খবর যখন সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সমস্ত দোকানপাট, অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে গেল। এবং ঢাকার যেসব আদিবাসী, মানে আমরা যাদের ঢাকাইয়া কুট্টি বলি, তারা পর্যন্ত এসে ছাত্রদের সমর্থন করল; যারা মুসলিম লীগের অন্ধ ভক্ত ছিল। সমস্ত জনগণ এবং বিভিন্ন স্তরের ও পেশার মানুষ এসে ছাত্রদের সমর্থন জানালেন। ২২, ২৩, ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্রমে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। এবং এই আন্দোলন যখন ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মফস্বল শহরে গিয়ে পৌঁছল, তখন সেখানেও ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি হলো। ধর্মঘট, হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল হতে থাকল। কারণ, জিন্নাহ বলেছিল, একমাত্র উর্দু এবং উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। তার প্রতিবাদে ছাত্ররাই বিদ্রোহ করেছিল এবং তারা ‘না, না’ বলে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানিয়ে ছিল। তখনকার আমাদের যে চারটি অন্যতম দাবি ছিল—(এক) রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, (দুই) সকল আঞ্চলিক ভাষার সমান মর্যাদা চাই, (তৃতীয়) সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে হবে, (চতুর্থ) সকল রাজবন্দির মুক্তি চাই।

এই যে স্লোগানগুলো, এই স্লোগানগুলোর ভিত্তিতে সাংঘাতিকভাবে গর্জে উঠেছিল সমগ্র পূর্ব বাংলা। এবং আন্দোলন একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল। মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং সরকারের বিরুদ্ধে তারা তাদের রায় দিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে মওলানা ভাসানী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করল এবং খুনি নুরুল আমিন একজন ছাত্রনেতার কাছে পরাজিত হলো এবং জামানত বাজেয়াপ্ত হলো। এটাই হলো বায়ান্নর স্মৃতি।

আমি তখন ছাত্র ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। মফস্বল শহরে পরীক্ষা দেবো। আমার জেলাতে যে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল, সেই মিছিলে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমার জেলা পাবনা। আমি তখন পাবনা জেলা স্কুলের পরীক্ষার্থী। ১০ মার্চ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই এ ঘটনা ঘটে গেল। তখন আমাদের মধ্যে একটা দারুণ প্রক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং সারা শহরে ছাত্র থেকে আরম্ভ করে, রিকশাশ্রমিক, বিড়িশ্রমিক এবং সকল স্তরের মানুষ তারা মিছিল বের করে পাবনায়। সেখানে আমি একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলাম।

Blogkori

Phasellus facilisis convallis metus, ut imperdiet augue auctor nec. Duis at velit id augue lobortis porta. Sed varius, enim accumsan aliquam tincidunt, tortor urna vulputate quam, eget finibus urna est in augue.

Post a Comment