“জিকির” বলতে আসলে কি বুঝায়?

 ***আসুন জেনে নিইঃ “জিকির” বলতে আসলে কি বুঝায়?***


জিকির বলতে সাদা চোখে আমাদের সামনে কতগুলো পরিচিত দৃশ্য ভেসে উঠে, আর স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরে নিয়েছি জিকির বলতে ঐ দৃশ্যগুলোই শুধুমাত্র বুঝায়। এই সব পরিচিত দৃশ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যটি হচ্ছে তসবিহ হাতে কাউকে দেখলেই আমরা বুঝি সে জিকির করছে। এরপর রয়েছে হাতের কর গুণে জিকির করার দৃশ্য। মোটামুটি এই দুটি দৃশ্য প্রায় সবাই দেখে অভ্যস্থ। জিকিরের আরো কিছু দৃশ্য আমাদের সামনে রয়েছে যেমন: মসজিদে বা কোন নির্দিষ্ট জায়গায় গোল হয়ে বসে সমস্বরে জিকির করা, মাইকে জিকির করা, মাজার-খানকা শরীফের মাথা দোলানো বাবরি ঝোলানো জিকির প্রভৃতি। আমাদের চারপাশে এভাবে দেখে আমরা অভ্যস্থ হয়ে গেছি, আর জিকিরটাকে কতগুলো বিশেষ কাঠামোতে আবদ্ধ করে ফেলেছি। সত্যিই কি জিকির বলতে এই দৃশ্যগুলোকে বুঝায়? আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি? আসুন আজকে কুরআন এবং সহীহ সুন্নাহ থেকে জানতে চেষ্টা করি জিকির বলতে সত্যিই কি বুঝায়। জিকির কিভাবে করতে হবে তার সুস্পষ্ট এবং সুন্দর বিবরণ কুরআন এবং সহীহ সুন্নাহতে রয়েছে।


“জিকির” শব্দটির অর্থ হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে ভয়ের সাথে, সমীহ করে। মুখে শুধু বলে গেলাম, হাতে তসবিহ নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম কিন্তু আল্লাহকে ভয় করলাম না, অন্তরে সে অনুভূতি জাগ্রত হলো না তখন এটাকে জিকির বলা উচিত হবে না। যখন কোন কাজ শুরু করতে যাব তখনি বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি, অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করি, আল্লাহকে ভয় করি, একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করেই কাজটি শুরু করি। যখন কোন জিনিস ধরতে যাব, বিসমিল্লাহ বলে ধরব, আল্লাহকে স্মরণ করব, ভয় করব অর্থাৎ যে কাজটি আমি শুরু করতে যাচ্ছি বা যে জিনিসটি ধরতে যাচ্ছি তাতে আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা সেটাও আমি ভয়ের সাথে স্মরণ করব। কাজটি যখন করবো, তখন সেটা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই করছি কিনা তাও ভয়ের সাথে স্মরণ করব, অর্থাৎ কাজটি করতে যেয়ে আমি কি কোন অংশীদার বানিয়ে ফেলছি? বা কাজটি কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করছি? বা লোকে আমার প্রশংসা করবে সেজন্য করছি? আবার যখন কোন খাবার খেতে যাব তখনও বিসমিল্লাহ বলে শুরু করব, আল্লাহকে স্মরণ করব, আমি যে খাবারটি খাচ্ছি সেটি কি হালাল বা খাবারটি কি হালাল উপার্জন দিয়ে ক্রয় করেছি?

কোন কাজ শুধু মৌখিক বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলাম কিন্তু বাস্তবে সেকাজে আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তখন তা জিকির হিসেবে গন্য হবে না। কিন্তু যদি আল্লাহকে স্মরণ করে, সমীহ করে সে কাজ থেকে বিরত থাকি তখন তা জিকির হিসেবে গন্য হবে। ছোট একটা বাস্তব উদাহরণ দিই: একবার এক লোককে দেখলাম, কিছু টাকা ঘুষ নিল এরপর বিসমিল্লাহ বলে তার কাজ শুরু করল! এখানে বিসমিল্লাহ বলাটা শুধু তোতা পাখির মতই বলা হল, বাস্তবে জিকির করা হল না, আল্লাহকে স্মরণ করা, ভয় করা হল না।

আল্লাহ তাআলা যে কাজ করতে বলেছেন সে কাজ সেভাবে করা এবং যে কাজ করতে নিষেধ করেছেন সে কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আমরা আল্লাহকে স্মরণ করি, আল্লাহকে সমীহ করি, আল্লাহকে ভয় করি এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাজ করি তাহলে এই পুরো ব্যাপারটিই জিকির বলে গন্য হবে! একটু অবাকই লাগছে তাই না? আসুন দেখি আল্লাহ তাআলা কি বলেছেন:
“অতএব তোমরা আমাকেই স্মরণ করো, (তাহলে) আমিও তোমদের স্মরণ করবো, তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করো এবং কখনো তোমরা আমার অকৃতজ্ঞ হয়েও না” (সূরা বাকারা: ১৫২)

আল্লাহ তাআলা এরপর সূরা বাকারাতে হজ্জ সংক্রান্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করা এবং ভয় করার বিষয়টি আরো সুন্দরভাবে বলে দিয়েছেন। (১৮৯ থেকে ২০০ আয়াতে হজ্জের বিভিন্ন কাজের বর্ণনা রয়েছে, আমি শুধু আল্লাহকে স্মরণ এবং ভয়ের অংশটুকু তুলে ধরছি)

“ইহরাম বাধার পর পিছনের দড়জা দিয়ে (ঘরে) প্রবেশ করার মাঝে কোন সওয়াব নেই, আসল সওয়াব হচ্ছে কে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করলো (তা দেখা, এখন থেকে) ঘরে ঢোকার সময় (সামনের) দুয়ার দিয়েই তোমরা আসা-যাওয়া করো, তোমরা একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে ভয় করবে, আশা করা যায় তোমরা কামিয়াব হতে পারবে।” (সূরা বাকারা: ১৮৯)
পূর্বে ইহরাম বাধার পর লোকজন ঘরে প্রবেশের প্রয়োজন হলে পিছন দিক দিয়ে প্রবেশ করতো, যা একটা বাহ্যিক কাজ ছিল; অর্থাৎ একাজের পিছনে আল্লাহর স্মরণ বা ভয় ছিল না, এরজন্যই আল্লাহ তাআলা বলে দিলেন সামনের দিক দিয়েই প্রবেশ কর তবে আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহকে ভয় করলেই তোমরা সফল হতে পারবে বাহ্যিক কোন আচার-অনুষ্ঠান দিয়ে নয়। এখন একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন, যারা তসবিহ হাতে নিয়ে, গোল হয়ে বসে, মাঈকে চিৎকার করে, মাথা দুলিয়ে জিকির করার অনুষ্ঠান পালন করছে কিন্তু মনে ভয়ের কোন স্থান দিচ্ছে না, তাদের সেই জিকির কি জিকির হচ্ছে? জিকিরের প্রধানতম বিষয়টিই হবে গভীরভাবে আল্লাহকে স্মরণ এবং আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলা। আমরা যেকাজটি এভাবে করব অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করে এবং ভয় করে করবো সে কাজটিই জিকির বলে অভিহিত হবে।

“তবে (সর্বদাই) আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, মনের রেখো, যারা (সীমালংঘন থেকে) বেঁচে থাকে আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন” (সূরা বাকারা:১৯৪)
অর্থাৎ সব সময়ই আল্লাহর ভয় মনের মধ্যে থাকা, আল্লাহ যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন সে কাজগুলো থেকে একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে বিরত থাকা, তা সীমালংঘন না করা। আর যারা এভাবে আল্লাহকে ভয় করবে আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে রয়েছেন।

“যদিও আল্লাহর ভয়টাই হচ্ছে (মানুষের) সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয়, অতএব হে বুদ্ধিমান মানুষেরা, তোমরা আমাকেই ভয় করো” (সূরা বাকারা: ১৯৭)
অর্থাৎ আমরা আল্লাহকে ভয় করে যে কাজ থেকে বিরত থাকব, আল্লাহর কথা শুনব একমাত্র আল্লাহকে ভয় করে সেই ভয় করাটাই হবে আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয়। অন্য কাউকে ভয় করে নয়, একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে কাজটি করব, আর এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে বুদ্ধিমান মানুষেরা তোমরা আমাকেই ভয় করো।

“অতপর তোমরা যখন আরাফতের ময়ধান থেকে ফিরে আসবে তখন (মুযদালিফায়) ‘মাশায়ারে হারাম’ এর কাছে এসে আল্লাহকে স্মরণ করবে, (ঠিক) যেমনি করে আল্লাহ তাআলা তোমাদের (তাঁকে ডাকার) পথ বলে দিয়েছেন, তেমনি করে তাকে স্মরণ করবে” (সূরা বাকারা: ১৯৮)
আরাফাতের ময়দানে, মুযদালিফায়, মাশায়ারে হারামের নিকট যখন অবস্থান করতে হয় তখন এই কথা স্মরণ রাখতে হবে যে আমরা যে এই জায়গা গুলোতে যাচিছ তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা বলেছেন বলেই, অর্থাৎ আমরা আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে জিকির করছি।

“যখন তোমরা তোমাদের (হজ্জের যাবতীয়) আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নিবে তখন যেভাবে তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে, তেমনি করে বরং তার চাইতে বেশী পরিমাণে (এখন) আল্লাহকে স্মরণ করো” (সূরা বাকারা:২০০)
জাহিলিয়াতের যুগে মানুষজন তাদের পূর্বপুরুষদের খুব গুণগান গাইত, তাদেরকে তারা খুবই স্মরণ করতো। আল্লাহ তাআলা বলে দিলেন, হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শেষ কিন্তু তাই বলে আল্লাহর স্মরণ শেষ হয়ে যায় নি, আল্লাহকে এখন আরো অধিক হারে স্মরণ করো, যেমনভাবে তোমরা পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে, বরং তার চাইতে বেশী স্মরণ করো। হজ্জের পূর্বে যতটা আল্লাহকে স্মরণ করতে এখন তার চাইতে আরো বেশী আল্লাহকে স্মরণ করবে, প্রতিটা কাজে আল্লাহকে স্মরণ করবে, আল্লাহকে ভয় করে করবে, নাফরমানী করবে না।

অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করা, আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহকে ভয় করে তার নির্দেশিত পথে চলা, আল্লাহকে ভয় করে নাফরমানী মূলক কাজ থেকে বিরত থাকা, সীমালংঘন না করা; এ সবই জিকিরের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

“হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহকে ভয় কর এবং সৎ লোকের সঙ্গী হও” (সুলা আত তওবা:১১৯)

এরপর আসি সহীহ সুন্নাহতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই যত্নের সাথে তাঁর সাহাবাদের বিভিন্ন দোয়া শিখিয়ে দিতেন যে দোয়াগুলোর প্রধানতম বিষয় হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা, আল্লাহকে গভীরভাবে স্মরণ করা, আল্লাহকে ভয় করা।
নামায হচ্ছে জিকির গুলোর মধ্যে অন্যতম, অর্থাৎ নামাযে অধিকহারে আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। নামায শেষ হয়ে গেলে কি করতে হবে তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের শিখিয়ে দিতেন।

“(হে নবী) যে কিতাব তোমার নাযিল করা হয়েছে, তুমি তা তিলাওয়াত করো এবং নামায প্রতিষ্ঠা করো; নিসন্দেহে নামায (মানুষকে) অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে; পরন্তু আল্লাহকে হামেশা স্মরণ করাও একটি মহান কাজ, তোমরা যা কিছু করো তা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তা সম্যক অবগত আছেন” (সূরা আনকাবুত :৪৫)
নামাযে আল্লাহকে স্মরণ করা হচ্ছে, আল্লাহর আদেশ নিষেধ সম্পর্কে মনে ভয় তখন আরো জেগে উঠে যা অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামায শেষ কিন্তু তার পরেও আল্লাহকে স্মরণ করা, তা একটি মহান কাজ।

“হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, জুমআর দিনে যখনা তোমাদের নামাযের জন্যে ডাক দেওয়া হবে তখেন তোমরা (নামাযের মাধ্যমে) আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাও এবং (সে সময়ের জন্য) কেনাবেচা ছেড়ে দাও, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা তা উপলব্ধি করো। অতপর যখন (জুমআর) নামায শেষ হয়ে যাবে তখন তোমরা (কাজেকর্মে) পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো, আর আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করো, আশা করা যায় তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে” (সূরা জুমআহ:৯-১০)
অর্থাৎ জুমআর নামাযে যাও আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য, নামাযের পড় যখন কাজে বেরিয়ে পড়বে তখনও আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে। যে কাজটি করতে যাব তাতে থাকবে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থা, নাফরমানী মূলক কিছু থাকবে না। আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে আমরা সাফল্যমন্ডিত হতে পারবো।

আর এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের বিভিন্ন দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ থেকে বান্দাহ যেন বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয়, সেই ট্রেনিং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের দিয়েছেন। আল্লাহকে স্মরণ করেই বান্দাহ আল্লাহ নির্দেশিত কাজ করবে, আল্লাহকে স্মরণ করে বান্দাহ আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধকৃত কাজ থেকে বিরত থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের পর যে দোয়াগুলো বলতেন সেগুলো মধ্যে কিছু তুলে ধরলাম:

নামাযে সালাম ফেরানোর পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবীরা সরবে একবার আল্লাহু আকবর পড়তেন।( বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী)

আস্তাগফিরুল্লাহ তিনবার পড়ার পরই পড়তেন “আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালাম তাবারাকতা ইয়া যাল যালালি ওয়াল ইকরাম” অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি শান্তিময়, তোমার থেকেই শান্তি অবতীর্ণ হয়। তুমি বরকতময়, হে পরাক্রমশালী ও মর্যাদা প্রদানকারী”। (মুসলিম, আবু দাউদ, দারেমী, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাযাহ)

সুনহানাল্লাহ (৩৩বার), আলহামদুলিল্লাহ (৩৩বার) ও আল্লাহু আকবর (৩৪বার) (মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী)

“আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল জুবনি ওয়া আউযুবিকা মিন আন উরাদ্দা ইলা আরযালিল উমুরি ওয়া আউযুবিকা মিন আযাবিল কাবরি ওয়া আউযুবিকা মিন ফিতনাতিদ্দুনইয়া” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি কাপুরুষতা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই। এবং (বার্ধক্যে) নিকৃষ্টতম জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া থেকেও আপনার কাছে আশ্যয় চাই এবং কবরের আযাব থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আরো আশ্রয় চাই আপনার কাছে দুনিয়ার ফিতনা থেকে”। (বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী, আহমাদ)

“সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী আদাদা খালকিহী ওয়া রিদা নাফসিহী ওয়া যিনাতা আরশিহী ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি” (৩বার)। অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সৃষ্টি পরিমাণ আর তাঁর সত্ত্বার সন্তুষ্টি পরিমাণ, তাঁর আরশের ওজন পরিমাণ এবং তাঁর বাণী সমূহ লিপিবদ্ধ করার কালি পরিমাণ পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি”। (মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনু মাযাহ)

“আল্লাহুম্মা আজিরনী মিনান্নার” (৭বার) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নাম হতে আশ্রয় দাও”(আবু দাউদ)

এরকম আরো অনেক দোয়া সহীহ সুন্নাহতে রয়েছে যেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয সালাতের পর পড়তেন। এই সব দোয়গুলোর মধ্যে রয়েছে গভীরভাবে আল্লাহকে স্মরণ, আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহর প্রশংসা, একত্ববাদের ঘোষণা।

এতক্ষণ যে দীর্ঘ আলোচনা করলাম এটাই জিকিরের মূল বিষয়, কিন্তু আজকে যারা জিকির নাম দিয়ে কতগুলো পন্থা আবিস্কার করে নিয়েছে আর সেই আনুষ্ঠানিকতাকে শুধুমাত্র জিকির বলে অভিহিত করছে তারা বিদআত করছে কোন সন্দেহ নেই। বিভিন্ন খানকা, মাজার, পীর, ফকির প্রভৃতি এরা জিকিরের নামে অনেক পন্থা আবিস্কার করছে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত বা থাকলেও তাকে বিকৃত করে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করছে। একটা বিষয় একজন মুসলিমের অবশ্য মনে রাখতে হবে, ইবাদত করার সময় দুটি বিষয় হচ্ছে প্রধান, ১. ইবাদতটি হবে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ২. ইবাদতটি করতে হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেখানো পন্থায়। এই দুইটি বিষয় ইবাদতের মাঝে অবশ্য উপস্থিত থাকতে হবে, একটি থাকল অন্যটি অনুপস্থিত থাকলো তাহলে সেটি ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যারাই দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন পন্থা উদ্ভাবন করবে যা আমাদের মাঝে (সুন্নাহতে) নেই তা বাতিল পরিগণিত হবে” (বুখারী ও মুসলিম)

“তোমরা নিজেদেরকে নবউদ্ভাবিত বিষয়(ইবাদত) সমূহ থেকে দূরে রেখ, কেননা প্রত্যেক নবউদ্ভাবিত (দ্বীনি) বিষয়ই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআত হচ্ছে ভ্রান্তি বা ভুল পথ” (তিরমিযী)

“দ্বীনি বিষয় সমূহের মধ্যে নবউদ্ভাবিত বিষয়গুলোই সবচেয়ে নিকৃষ্ট আর সকল নবউদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা, আর সকল ভ্রষ্টতাই জাহান্নামে পতিত হবে” (মুসলিম, নাসাঈ)

মূল বিষয়গুলো একদৃষ্টিতেঃ
***সবসময়ই আল্লাহকে স্মরণ ও ভয় করতে হবে।
***নামাযের পর যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো দোয়াগুলো পড়ব তখন আল্লাহকে গভীরভাবে স্মরণ করবো এবং ভয় করবো।
***কোন কাজ করতে গেলেই আল্লাহকে স্মরণ করে করবো এবং আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা সমূহ থেকে বিরত থাকব এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে দেখানো পথে করবো।
***ইবাদত করার ক্ষেত্রে আল্লাহকে স্মরণ এবং ভয় করাটাই প্রধান।
***যে কাজই আমরা আল্লাহকে স্মরণ ও ভয় করে করবো তাই জিকির।
***যে কাজই করবো তা একমাত্র আল্লাহর জন্য করবো। অন্য কারো প্রশংসা, বাহবা, সন্তুষ্টি, খ্যাতি অর্জনের জন্য করবো না।
“তুমি (একান্ত বিনয়ের সাথে) বলো, অবশ্যই আমার নামায, আমার (আনুষ্ঠানিক) কাজকর্ম, আমার জীবন, আমার মৃত্যু- সবকিছুই সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহ তাআলার জন্য”। (সূরা আল আনআম: ১৬২)
***বিদআত থেকে বিরত থাকবে কেননা বিদআত জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে।

আল্লাহকে স্মরণ, আল্লাহকে ভয় করে জীবন অতিবাহিত করাটাই হচ্ছে মুসলিমের জীবন। সর্বশেষ যে আয়াতটি দিয়ে আমার লেখা শেষ করবো:
“তোমরা তাদের মতো হয়ে যেয়ো না যারা (দুনিয়ার ফাঁদে পড়ে) আল্লাহকে ভুলে গেছে এবং এর ফলে আল্লাহ তাআলাও তাদের (নিজ নিজ অবস্থা) ভুলিয়ে দিয়েছেন, (আসলে) এরা হচ্ছে নাফরমান” (সূরা হাশর:১৯)
আজকে যারা আল্লাহকে স্মরণ করা বাদ দিয়ে দিয়েছে, আল্লাহকে ভয় করে কাজ করা বাদ দিয়ে দিয়েছে তারা দুনিয়ার ফাঁদে আটকা পড়েছে। তারা তাদের নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান, আত্মভোলা হয়ে গিয়েছে। জীবনের মানে খুজে ফিরছে, যেনতেনভাবে জীবন অতিবাহিত করাটাকেই সর্বেসর্বা মনে করছে, বানরের মাঝে নিজেদের অস্তিত্ব খুজে ফিরছে। আল্লাহর কথা হামেশা অমান্য করছে আর এই ব্যাপারে তাদের মনে কোন ভয়ের অস্তিত্ব জেগে উঠছে না।

মহান আল্লাহ আমাদের হিফাজত করুন এবং আমরা যেন শুধুমাত্র আল্লাহকে স্মরণ ও ভয় করে সকল কাজ করতে পারি, আমাদের সকল কাজগুলো যেন হয় শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য। আমীন।

Blogkori

Phasellus facilisis convallis metus, ut imperdiet augue auctor nec. Duis at velit id augue lobortis porta. Sed varius, enim accumsan aliquam tincidunt, tortor urna vulputate quam, eget finibus urna est in augue.

Post a Comment