হাজারীখিল অভয়ারণ্যে ১২৩ প্রজাতির পাখির সন্ধান

হাজারীখিল অভয়ারণ্যে ১২৩ প্রজাতির পাখির সন্ধান


চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চল। এ বনাঞ্চলের মধ্যেই রয়েছে বিচিত্র সব বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হাজারীখিল, যেখানে দেখা মিলেছে ১২৩ প্রজাতির পাখি। রঙ-বেরঙের এসব পাখির মধ্যে রয়েছে বিপন্ন প্রায় কাঠময়ূর ও মথুরা। আছে কাউ ধনেশ ও হুতুম পেঁচাও।

বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের সমারোহ থাকার কারণে চিরসবুজ এই বনে এমন কিছু প্রজাতির পাখি পাওয়া গেছে, যা অন্য কোনো বনে সচরাচর দেখা যায় না। এর মধ্যে রয়েছে হুদহুদ, চোখ গেল, নীলকান্ত, বেঘবৌ, আবাবিল। এসব পাখির আকার-আকৃতি, বর্ণ ও স্বভাবে বৈচিত্র্যময়। সম্প্রতি বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এক গবেষণায় পাখির এসব প্রজাতির সন্ধান পায় গবেষক দল।

এ অভয়ারণ্যে নানা প্রজাতির পাখির সঙ্গে শীতকালে যোগ দেয় পরিযায়ী পাখির দল। এদের বিচরণে চিরসবুজ বন পরিণত হয় পাখিরই আলাদা এক রাজ্যে। বনের খাদ্যশৃঙ্খলে স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখা, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, উদ্ভিদের পরাগায়ন ও বীজের বিস্তারে এ পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন পাখি বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশের বিপন্নপ্রায় পাখিরও নিরাপদ আবাসস্থল হবে এ অভয়ারণ্য।

‘এভিয়ান স্পিসিজ ডাইভারসিটি অব হাজারীখিল ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি, চিটাগং’শিরোনামের এ গবেষণাকর্মে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের বন্যপ্রাণী শাখার সিনিয়র রিসার্চ অফিসার মো. আনিসুর রহমান। গবেষণায় সহায়তা করেন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (গ্রেড-১) মো. কামরুল ইসলাম ও ফিল্ড ইনভেস্টিগেটর শেখ মো. মাঈন উদ্দীন।

গবেষক দলের প্রধান মো. আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পরিচালিত এটিই প্রথম কোনো গবেষণাকর্ম। এ গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, অভয়ারণ্যটিতে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রজাতির পাখির একটি চেকলিস্ট তৈরি করা, যাতে পরবর্তীতে পাখি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় তা সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগানো যায়। আমাদের গবেষণায় এ অভয়ারণ্যে মোট ১২৩ প্রজাতির পাখির অস্তিত্ব পেয়েছি। এর মধ্যে অনেক প্রজাতিই রয়েছে বিপন্নপ্রায়। আকার-আকৃতি, বর্ণ কিংবা স্বভাবে বেশ বৈচিত্র্যময় পাখির সন্ধান মিলেছে হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে।’

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকার যেসব প্রাকৃতিক বনভূমিকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের ‘হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।’ ফটিকছড়ি উপজেলার রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চলে প্রায় ১১৮ হেক্টর পাহাড়ি বনভূমিকে ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দেয় সরকার। এখানকার উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে— বানর, হনুমান, মায়া হরিণ, বুনো ছাগল, চিতা বিড়াল ও মেছো বাঘ। মিশ্র চিরসবুজ বনসমৃদ্ধ এ অভয়ারণ্যের প্রধান বৃক্ষ গর্জন, চাপালিশ, সেগুন, কড়ই, মেহগনি ও চুন্দুল। বিখ্যাত রাঙ্গাপানি চা বাগান এ অভয়ারণ্যের পাশেই অবস্থিত। মূলত এখানকার উদ্ভিদরাজির কারণেই টিকে আছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী।

হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এমনই এক প্রজাতির পাখি ‘চোখ গেল’। অভয়ারণ্যের আরেক বিচিত্র পাখির নাম হুদহুদ, স্থানীয়রা যাকে ‘কাঠঠোকরা’ নামে ডাকে। সম্পূর্ণ মাটিতে হেঁটে খাবার সংগ্রহ করে পাখিটি। কীটপতঙ্গ খাওয়া এ পাখি বাসা বাঁধে গাছের কোঠরে। অরণ্যের খুব গভীরে ঝোপঝাড়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করে মথুরা। বনমোরগের স্বভাবজাত এ পাখি জোড়ায় জোড়ায় চলাচল করে। বিপন্নপ্রায় মথুরা বনের যেসব এলাকায় বাস করে, সেসব এলাকায়ই বিচরণ আছে কাঠময়ূরেরও। খুবই লাজুক প্রকৃতির এ পাখির দেখা মেলাই ভার। শস্যদানার পাশাপাশি কীটপতঙ্গই এদের প্রিয় খাবার। তারা বাসা বাঁধে মাটি সরিয়ে কাঠি দিয়ে। মস্তবড় ঠোঁট এবং তার উপরে শিরস্ত্রাণের জন্য বিখ্যাত পাখি ‘কাউ ধনেশ’। এরা ছোট ছোট দলে থাকতে পছন্দ করে। বটজাতীয় নরম বৃক্ষে বিচরণ করা বিপন্নপ্রায় এ পাখি টিকটিকি, ইঁদুর এমনকি অন্যান্য পাখির ছানাও খেয়ে থাকে। পানির কাছাকাছি কোনো বড় অন্ধকার গাছে ডালপালার মধ্যে আত্মগোপন করে থাকে হুতুম পেঁচা। এদেরও পছন্দের খাবারের তালিকায় রয়েছে মাছ, কাঁকড়া ও ব্যাঙ। তবে ইঁদুর ও সরীসৃপজাতীয় প্রাণীও ভক্ষণ করে থাকে। হুতুম হুতুম বলে ডাকে বলেই স্থানীয়রা এ পাখির নাম দিয়েছে ‘হুতুম পেঁচা’।

পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিচিত্র এসব পাখি। পাখিগুলো সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি চিরসবুজ বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পালন করছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাই প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু পাখির জন্য সব অভয়াশ্রম নিরাপদ রাখার আহ্বান জানান তারা।

বিশিষ্ট পাখি বিশেষজ্ঞ ড. ইনাম আল হক বলেন, ‘হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য পাখির জন্য খুবই সমৃদ্ধ একটি বন। এখানে বণ্যপ্রাণীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। কিন্তু রয়েছে বিচিত্র আর বিপন্ন প্রজাতির পাখি। পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়েছে বনের পাখি। ক্রমাগত বনভূমি উজাড় করার ফলে আবাসস্থল হারাচ্ছে পাখি। ফলে দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে বেশকিছু পাখি এখন বিপন্ন। এতে ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে বনের প্রতিবেশ ব্যবস্থায়। পাখি ও প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

জানা গেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকায় বড় পরিবর্তন এসেছে অতিথি পাখির জীবনধারায়। সম্প্রতি পাখিগুলো শীতকালে প্রজননক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়া উষ্ণ দেশগুলোয় ভ্রমণ করতে যাচ্ছে আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক আগেই।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. শাহীন আক্তার বলেন, ‘হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। সম্প্রতি আমাদের পরিচালিত একটি গবেষণাকর্মের আলোকে বিরল ও বিপন্নপ্রায় প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিদেশী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থলও গড়ে তোলা হবে এ অভয়ারণ্যে। এছাড়া ছাত্রছাত্রী, গবেষক ও পাখিপ্রেমী মানুষের এ অভয়ারণ্যের পাখি-সম্পর্কিত তথ্য জানার পাশাপাশি পাখি সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি হবে।

হাজারীখিল অভয়ারণ্যের আরো যেসব পাখির দেখা মেলে তার মধ্যে রয়েছে— খুদে কাঠঠোকরা, বড় বসন্তবাউড়ি, নীলকান্ত, বেঘবৌ, ছোট বসন্তবাউড়ি, তিত মাছরাঙা, সাদা বুক মাছরাঙা, মেঘ হও মাছরাঙা, সবুজ সুইচোরা, খয়েরি মাথা সুইচোরা, নীল লেজ সুইচোরা, বড় কানাকুকা, বউ কথা কও, কোকিল, সবুজ কোকিল, সুরেলা কোকিল, তোতা, টিয়া, আবাবিল, নাক কাটি, লক্ষ্মীপেঁচা, খুরলে পেঁচা, ডোরা কালি পেঁচা, কালো পেঁচা, জালালি কবুতর, তিলা ঘুঘু, রাম ঘুঘু, ধলা ঘুঘু, ছোট হরিয়াল, কমলা বুক হরিয়াল, হলুদ পা হরিয়াল, ডাহুক, বনমোরগ, জয়াড কাঠঠোকরা, বর্মি কাঠঠোকরা, সবুজ কাঠঠোকরা, সোনালি কাঠঠোকরা, মেটে টুপি কাঠঠোকরা। আরো আছে— জলপিপি, হট্টিটি, মেটে মাথা হট্টিটি, বেশরা, তিলা ঈগল, ভুবন চিল, শঙ্খ চিল, ছোট মাছ মুরাল, ছোট বাজ, পানকৌড়ি, গো-বক, সাদা বক, মাইজলা বক, কানি বক, ওয়াক, শামুক খোল, ধূসর বুক টুনি, সাধারণ বন টুনি, পাতা বুলবুল, সবুজ বুলবুল, তাত শালিক, ঝুঁটি শালিক, গোবরে শালিক, কাঠশালিক, পাতিকাক, দাঁড়কাক, কুটুম পাখি, সবুজ হাঁড়িচাছা, ফিঙ্গে, কেশরাজ, ভীমরাজ, ছোট ফিঙে, হলদে পাখি, ফটিকজল, লাটোরা, আলতাপরী, লেজ নাচানি, বাদামি কসাই, বড় কাবাশি, চামচ কসাই, মেটে পিঠ কসাই, সিপাহী বুলবুল, কালো বুলবুল, ধূসর বুলবুল, কালো মাথা বুলবুল, শ্যামা, কালোঘর রাজন, দোয়েল, ফুটফুটি চটক, নীল শিলাদামা, শিলাদামা, লাল বুক চটক, মেটে মাথা ছোট চটক, নীলকান্তমণি চটক, এশীয় খয়েরি চটক, লেজ চেরা পাখি, টুনটুনি, সাত ভায়লা, সাদা মুকুট পাঙ্গা, পাঙ্গা, কালচে ফটক, ম্যাকারিন, বেগুনি বুক মৌটুসি, নীল টুনি, মৌচাটুনি, সিঁদুরে লাল মৌটুসি, বাধা টুনি, দাগি সাঁতারে, লাল ফুলঝুরি, তিত পাখি, চড়ুই পাখি, বাবুই, মাঠ চড়াই, তিলা মুনিয়া, বন খঞ্জন, সাদা খঞ্জন, ধূসর খঞ্জন ও হলদে মাথা খঞ্জন।

www.blogkori.tk

Blogkori

Phasellus facilisis convallis metus, ut imperdiet augue auctor nec. Duis at velit id augue lobortis porta. Sed varius, enim accumsan aliquam tincidunt, tortor urna vulputate quam, eget finibus urna est in augue.

Post a Comment